
গাংনী পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজার ১২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় উন্নয়নের নামে বড় অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সেই উন্নয়নের গুণগত মান, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব উপকারিতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্রমেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজাকে ঘিরে নানা অভিযোগ, সমালোচনা ও বিতর্ক সামনে আসায় বিষয়টি এখন জনমনে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত গাংনী পৌরসভাকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে তা নিয়ে সংশয় কাটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ১২৭ কোটি টাকার ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের বর্তমান চিত্র ভিন্ন কথা বলছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব প্রকল্পের আওতায় ড্রেন নির্মাণ, সড়ক কার্পেটিং, আরসিসি ও ইউনিব্লক রাস্তা, মার্কেট নির্মাণ, পার্ক উন্নয়ন, গোরস্থান উন্নয়ন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নানা অবকাঠামোগত কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশেই অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিম্নমানের কাজ হয়েছে।
পৌরবাসীর অভিযোগ, অনেক স্থানে সড়ক নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ছে। কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকর নয়, ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে থাকার সমস্যা আগের মতোই রয়ে গেছে। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার বাস্তব সুফল পাচ্ছেন না তারা।
বিশেষ করে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব টয়লেট এমন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে মানুষের যাতায়াত কম, ফলে সেগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে টয়লেটগুলো অযত্নে পড়ে রয়েছে কিংবা বন্ধ অবস্থায় আছে। এতে করে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, নাগরিক সেবা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পৌরবাসী। তাদের অভিযোগ, হোল্ডিং ট্যাক্সসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়া অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কোনো কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে চাইলে ঘুষ দিতে হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেকেই বলেন, অর্থ প্রদান করলে দ্রুত সেবা পাওয়া যায়, আর তা না হলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকলেও তাদের জীবনযাত্রার মানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নানা ক্ষেত্রে হয়রানি বেড়েছে। তাদের মতে, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় জনগণের প্রকৃত চাহিদা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
অভিযোগের তীর সরাসরি পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজার দিকে নির্দেশ করছেন অনেকেই। তাদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে তার তদারকির ঘাটতি রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে গত প্রায় ২২ মাসে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, অল্প সময়ের মধ্যে কিছু মানুষের জীবনযাত্রার মানে হঠাৎ পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক নয়। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজা। তিনি বলেন, “প্রকল্প অনুযায়ীই সব কাজ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। নির্ধারিত মান বজায় রেখেই কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।” তিনি অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আনোয়ার হোসেন জানান, এখনো তার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তবে অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কেউ লিখিতভাবে অভিযোগ দিলে আমরা গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখব এবং প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
তবে স্থানীয়দের মতে, লিখিত অভিযোগের অপেক্ষা না করে প্রশাসনের উচিত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি তদন্ত করা। কারণ অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ভয় বা ঝামেলার আশঙ্কায় লিখিত অভিযোগ করতে চান না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প শুধু অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
গাংনী পৌরসভার বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার যথাযথ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং নানা ক্ষেত্রে দুর্ভোগ বাড়ছে।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের দাবি—দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হোক। যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
গাংনী পৌরসভাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে হলে শুধু প্রকল্প গ্রহণই যথেষ্ট নয়; বরং সেই প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
বর্তমানে গাংনী পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে বড় বাজেটের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অন্যদিকে রয়েছে বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, কঠোর নজরদারি এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তবেই প্রকৃত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হবে এবং পৌরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হবে।